Sunday, September 11, 2016

হে মোর চিত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।
হেথায় দাঁড়ায়ে দু বাহু বাড়ায়ে নমি নরদেবতারে--
উদার ছন্দে, পরমানন্দে বন্দন করি তাঁরে।
ধ্যানগম্ভীর এই-যে ভূধর,   নদী-জপমালা-ধৃত প্রান্তর,
হেথায় নিত্য হেরো পবিত্র ধরিত্রীরে--
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে ॥
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর   

কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা
দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্রে হল হারা।
হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন--
শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন।
পশ্চিমে আজি খুলিয়াছে দ্বার,   সেথা হতে সবে আনে উপহার,
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে--
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে ॥
    
এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু-মুসলমান।
এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ, এসো এসো খৃস্টান।
এসো ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন ধরো হাত সবাকার।
এসো হে পতিত, হোক অপনীত সব অপমানভার।
মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা,   মঙ্গলঘট হয় নি যে ভরা
সবার-পরশে-পবিত্র-করা তীর্থনীরে--
আজি ভারতের মহামানবের সাগরতীরে ॥

নিমন্ত্রণ, জসীম উদ্দিন

নিমন্ত্রণ

জসীম উদ্দিন



তুমি যাবে ভাই - যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি
মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভাইয়ের স্নেহের ছায়,
তুমি যাবে ভাই - যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
ছোট গাঁওখানি- ছোট নদী চলে, তারি একপাশ দিয়া,
কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া;
ঘাটের কিনারে আছে বাঁধা তরী
পারের খবর টানাটানি করি;
বিনাসুতি মালা গাথিছে নিতুই এপার ওপার দিয়া;
বাঁকা ফাঁদ পেতে টানিয়া আনিছে দুইটি তটের হিয়া।
তুমি যাবে ভাই- যাবে মোর সাথে, ছোট সে কাজল গাঁয়,
গলাগলি ধরি কলা বন; যেন ঘিরিয়া রয়েছে তায়।
সরু পথ খানি সুতায় বাঁধিয়া
দূর পথিকেরে আনিছে টানিয়া,
বনের হাওয়ায়, গাছের ছায়ায়, ধরিয়া রাখিবে তায়,
বুকখানি তার ভরে দেবে বুঝি, মায়া আর মমতায়!
তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে - নরম ঘাসের পাতে
চম্বন রাখি অধরখানিতে মেজে লয়ো নিরালাতে।
তেলাকুচা - লতা গলায় পরিয়া
মেঠো ফুলে নিও আঁচল ভরিয়া,
হেথায় সেথায় ভাব করো তুমি বুনো পাখিদের সাথে,
তোমার গায়ের রংখানি তুমি দেখিবে তাদের পাতে।
তুমি যদি যাও আমাদের গাঁয়ে, তোমারে সঙ্গে করি
নদীর ওপারে চলে যাই তবে লইয়া ঘাটের তরী।
মাঠের যত না রাখাল ডাকিয়া
তোর সনে দেই মিতালী করিয়া
ঢেলা কুড়িইয়া গড়ি ইমারত সারা দিনমান ধরি,
সত্যিকারের নগর ভুলিয়া নকল নগর গড়ি।
তুমি যদি যাও - দেখিবে সেখানে মটর লতার সনে,
সীম আর সীম - হাত বাড়াইলে মুঠি ভরে সেই খানে।
তুমি যদি যাও সে - সব কুড়ায়ে
নাড়ার আগুনে পোড়ায়ে পোড়ায়ে,
খাব আর যত গেঁঢো - চাষীদের ডাকিয়া নিমন্ত্রণে,
হাসিয়া হাসিয়া মুঠি মুঠি তাহা বিলাইব দুইজনে।
তুমি যদি যাও - শালুক কুড়ায়ে, খুব - খুব বড় করে,
এমন একটি গাঁথিব মালা যা দেখনি কাহারো করে,
কারেও দেব না, তুমি যদি চাও
আচ্ছা না হয় দিয়ে দেব তাও,
মালাটিরে তুমি রাখিও কিন্তু শক্ত করিয়া ধরে,
ও পাড়াব সব দুষ্ট ছেলেরা নিতে পারে জোর করে;
সন্ধ্যা হইলে ঘরে ফিরে যাব, মা যদি বকিতে চায়,
মতলব কিছু আঁটির যাহাতে খুশী তারে করা যায়!
লাল আলোয়ানে ঘুঁটে কুড়াইয়া
বেঁধে নিয়ে যাব মাথায় করিয়া
এত ঘুষ পেয়ে যদি বা তাহার মন না উঠিতে চায়,
বলিব - কালিকে মটরের শাক এনে দেব বহু তায়।
খুব ভোর ক’রে উঠিতে হইবে, সূয্যি উঠারও আগে,
কারেও ক’বি না, দেখিস্ পায়ের শব্দে কেহ না জাগে
রেল সড়কের ছোট খাদ ভরে
ডানকিনে মাছ কিলবিল করে;
কাদার বাঁধন গাঁথি মাঝামাঝি জল সেঁচে আগে ভাগে
সব মাছগুলো কুড়ায়ে আনিব কাহারো জানার আগে।
ভর দুপুরেতে এক রাশ কাঁদা আর এক রাশ মাছ,
কাপড়ে জড়ায়ে ফিরিয়া আসিব আপন বাড়ির কাছ।
ওরে মুখ - পোড়া ওরে রে বাঁদর।
গালি - ভরা মার অমনি আদর,
কতদিন আমি শুনি নারে ভাই আমার মায়ের পাছ;
যাবি তুই ভাই, আমাদের গাঁয়ে যেথা ঘন কালো গাছ।
যাবি তুই ভাই, যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়।
ঘন কালো বন - মায়া মমতায় বেঁধেছে বনের বায়।
গাছের ছায়ায় বনের লতায়
মোর শিশুকাল লুকায়েছে হায়!
আজি সে - সব সরায়ে সরায়ে খুজিয়া লইব তায়,
যাবি তুই ভাই, যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গায়।
তোরে নিয়ে যাব আমাদের গাঁয়ে ঘন-পল্লব তলে
লুকায়ে থাকিস্, খুজে যেন কেহ পায় না কোনই বলে।
মেঠো কোন ফুল কুড়াইতে যেয়ে,
হারাইয়া যাস্ পথ নাহি পেয়ে;
অলস দেহটি মাটিতে বিছায়ে ঘুমাস সন্ধ্যা হলে,
সারা গাঁও আমি খুজিয়া ফিরিব তোরি নাম বলে বলে।

প্রাক্তন প্রেমিকার কাছে লেখা চিঠি

প্রিয় একসময়ের প্রেমিকা,
সময়ের সাথে মানুষের গন্ধটাও বদলায় । একসময় অনেক দুরথেকে
বলতে পারতাম তুমি আশেপাশে আছো । আমি কুকুর পুষি হয়তো তার কাছ থেকে এই গুনটি পেয়েছি । কুকুর যেমন একই এলাকার বাসিন্দাকে দূর থেকে গন্ধ শুকে বলতে পারে ও তার বন্ধু না শত্র“ তেমনি আমিও চিনতাম তোমার পায়ের শব্দ, গন্ধ । আজ কিন্তু সেটা কেমন যেন অপরিচিত মনে হয় ! আজ অনেকদিন পরে তোমায় দেখলাম সত্যি চিনতে পারিনি ! কোন ইন্দ্রিয় বলেনি তোমাকে চেনে ! হয়তো তারা সেই তোমাকে পায়নি , তাই আমাকে কিছু বলে নি । কি করবো বল , যে তোমার সাথে কথা বলে কথা শেষ হতো না আজ কোন কথাই মুখে আসেনি !
তুমি আশেপাশে আসার সাথে সাথেকেমন যেন উৎকট গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছিল , বমি আসছিল ,। পরপুরুষে ছুঁলে বুঝি এমন হয় ! তুমি ধারেরকাছে যতক্ষণ ছিলে আমি শ্বাস নিতে পারিনি , আমার অক্সিজেন কে যেন কেড়ে নিয়েছিল । তোমাকে দেখে আমার খুব ঘৃণা লাগছিল , সাথে বমি। মনে হয়েছিল কে এই দুরাত্মা , পাপী , বারবনিতা , রক্ষিতা । বের করে দাও একে এখান থকে , এ এই সুন্দর পরিবেশ নষ্ট করছে !
সত্যি এমন ঘৃণা জাগবে আমি জানিনি ! অথচ ভেবেছিলাম তোমার সাথে
কোনদিন দেখা হলে চোখের জল হয়তো বাঁধ মানবে না । সময় কত নিষ্ঠুর না ! বদলে দিয়েছে দুজনকে । সত্যি তোমার প্রতি আজ আমার কোন ভালবাসা নাই , যা আছে তা শুধু ঘৃণা । তুমি প্রতারক ! বি সি এস ক্যাডারের কাছে বিক্রি হয়েছিলে , আবিষ্কার করেছিলাম দুজনকে হলের সামনে ,সেদিন দুনিয়াটা আমার অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল । অনেক কষ্টে সে দিন গুলোর কথা ভুলেছি । অনেক রাগ হয়েছে তোমার উপর, মনে হয়েছে দুজনকে পিটিয়ে সোজা করে দি । আমার ক্যা¤পাসে আমার চোখের সামনে ঘুরেছ , কিছু বলি নি । কিন্তু আজ ! দিন সবার একভাবে যায় না । আজ তুমি ভিখারি আমি রাজা ! প্রতিশোধ নিতে পারি কিন্তু নেব না । দূর হয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে ! পন্যা , পতিতা কোথাকার !
দ্যাখো, সে দিন আমি তোমার জন্য কেঁদেছি আজ কত ঘৃণা করি তোমায়।
যা হোক ভালো থেকো , আমি তোমায় ক্ষমা করে দিয়েছি অনেক আগেই !

পাখির ফিরে আসা

ফিরে এল পাখি আমার । আজ পাঁচ বছর পরে । স্বামীর সাথে বনিবনা হয়নি তাই আমার কাছে চলে এলো । একদিন বলেছিলাম ,'' আমার দরজা সারাজীবন তোমার জন্য খোলা থাকবে , জীবনের যে কোন সময় আমার কাছে এসো , আমি তোমাকে গ্রহণ করব ।'' তাই সে আজ আমার কাছে ভরসা খুজতে এলো । অথচ একদিন আমার কাছে ভরসা না পেয়ে ওই লোকের জন্য আমাকে কষ্ট দিয়ে চলে গিয়েছিল ।
তোমাকে নিয়ে আমি সেন্ট মারটিন যাবো ? গিয়েছিলে তোমার স্বামীকে নিয়ে ওখানে ? জিজ্ঞেস করবো না কোনদিন । কারন আমি আর তুমি ক্যাম্পাসে কত ঘুরেছি , সেই সব জায়গায় তুমি তোমার স্বামীকে নিয়ে ঘুরেছ । আমার কথা মনেও পড়েনি তখন ।
আচ্ছা, কি করেছিল লোকটা ? চলে যাওয়ার সময় বলেছিলে,'' লোকটার বয়স ৩৮ । তাকে আমি সৎ মনে করি না । সে এই পর্যন্ত এসেছে নিশ্চয়ই প্রেম , সেক্স এগুলো করেছেই । এতে আমি কিছু মনে করি করি না ।''
অথচ তুমি আমার প্রথম প্রেম ছিলে ! কি পার্থক্য ছিল লোকটার আর আমার ? অনেক তাইনা ? সে বি সি এস ক্যাডার আর আমি মাত্র ছাত্র । আমার একটা দোষ তুমি ক্ষমা করতে না অথচ তার বেলায় সাতখুন মাপ । মর্যাদার জন্যই আমাকে ছেড়েছিলে । মর্যাদা পেলে কোথায় ? মর্যাদা পাওনি তাই ফিরে এসেছ ?
কিন্তু আমিতো সেই আমি নাই । তুমি দুঃখ দিয়েছিলে বোলেই পৃথিবীটা দেখতে বেরিয়েছি । দেখেছি পৃথিবীতে তোমার চেয়েও সুন্দর মেয়ে আছে । তোমার চেয়েও সুন্দর করে মানুষ কথা বোলতে পারে । দেখেছি যারা আমার মত ছাত্র আর জন্য কি করবে না করবে হতবুদ্ধ হয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছে , ভাইয়া ভাইয়া বলে গলা শুকিয়েছে ।
তোমাকে এখন আর তাদের পাশে ঠাই দিয়ে পারি কই । লোভে পড়েছিলে , ভালো রেস্টুরেন্টে খাওয়া , বি সি এস ক্যাডার এর বউ , কি মর্যাদা তাই না ! দামি দামি সুন্দর সুন্দর পোশাক , কি সুখ! আহা ! সে সুন্দর করে কোর্ট শার্ট পরে ক্যাম্পাসে আসে ! এর আমি ভার্সিটির বিভিন্ন র‍্যালিতে পাওয়া ফ্রি টিশার্ট পরেই জীবন কাটাই , ক্লাসে যাই, ঘুরে বেড়াই । তাই ছেড়ে গিয়েছিলে ?
শেষে একটা কথাই বলি । তুমি ছেড়েছিলে তাই পৃথিবী তার সৌন্দর্যে আমাকে মাতিয়েছে । দুহাত ভরে শূন্যতাকে সে পূর্ণ করেছে । আজ ফিরে এসেছ , কিন্তু তোমাকে দেয়ার মতো জায়গা কই বলো ? আমি যে সব কিছু পৃথিবীকে দিয়ে দিয়েছি !

পাখির প্রতি প্রেমপত্র

প্রেম করে বিয়ে করতে সাহস লাগে মেয়ে , তোমার মতো ভীরু মেয়ের দ্বারা তা হবে না ।
হু , তোমার দ্বারা হবে ?
হবে না মানে ? চলো আজই বিয়ে করবো ।
এভাবে আমি বিয়ে করবো না । মা বাবা কি বলবে ? পাড়া প্রতিবেশী কি বলবে ? আমাদের পাঁচ বোনের কেউ প্রেম করে বিয়ে করি নি । আর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি , মা বাবা কতো কষ্ট করে টাকা পাঠায় , আমি তাদের মনে কষ্ট দিতে পারবো না ।
বাল , প্রেম করার সময় মনে ছিল না ? আমার চার বছর নষ্ট করে এখন উনি কাহিনী জুড়েছেন ।
দেখো রাজীব , মা কে আমি কষ্ট দিতে পারবো না । মা এমনিতেই হাইপ্রেশারের রোগী । একথা শুনলে উনি মারাই যাবেন ।
কেন , তোমার ফুফা করেছিল , তার মা মারা গিয়েছিল ? তোমার বাবা করেছিল , তাঁর মা মারা গিয়েছিল ?
দ্যাখো , ওনাদের কথা আলাদা ।
বালের আলাদা । মেজাজ খারাপ কর না । মা কি বিলবে , বোনেরা কি বলবে তার ভয়ে উনি প্রেমের সমাধি দিবেন । আরে পাখি , লোকের তো আর কাজ নাই , আমাদের কথা নিয়ে ওনাদের ঘুম হারাম করবে । লোকে প্রেমের বিয়েকে ভালোই বলে । মুখে যাই বলুক না কেন । প্রেম করে কয়জন তার প্রেমিকাকে বিয়ে করতে পেরেছে ? সবাই চায় প্রেমের জয় হোক । আমিও চাই প্রেমিক প্রেমিকার মিলন হোক । ক্যাম্পাসে ছেলেরা অনেক সময় প্রেমিক জুটিকে র‍্যাগ দেয় । আমি ওদের বলি ,‘’দ্যাক ভাই , প্রেম স্বর্গীয় , ওদের মিলন হোক । তোমরাও তোমাদের প্রেমিকাকে পাও জীবন সাথী করে । ওদের সুখে থাকতে দাও । কিছু কিছু ছেলের প্রিয়তমা এতো সাহসী যে সবকিছু তুচ্ছ করে প্রেমিকের কাছে ছুটে আসে । এমনইতো চাই । আমি পারি নাই বলে তাতে কি ? ওরা তো পারছে । ‘’ শুনে ওরা চুপ করে মন খারাপ করে চলে যায় । হয়তো ওদের মনে হয়ে যায় , একটু সাহসের অভাবে একদিন সে তার প্রিয়াকে হারিয়েছে । হয়তো তাকে শুনতে হয়েছে ,’’আপনি অতো সাহসী না ।‘’
বলবেই তো , পটানোর কথা সব । বিয়ে করবে খাওয়াবে কি ? আমার ইচ্ছা মন্ত্রীদের মেয়েদের যেমন ধুমধাম করে দিয়ে হয় আমার তেমনি হবে । ৩২ ভরি সোনার অলঙ্কার আমার গায়ে থাকবে । আর মা বাবাকে কষ্ট দিয়ে বিয়ে করলে ওনারা অভিশাপ দেবে । ওই ছেলেকে বিয়ে করলে মা বাবা অনেক খুশি হবে । আমি সুখে না থাকলেও সুখী খাকার ভান করবো । দেখেছো ছেলেটা ম্যাজিস্ট্রেট শুনে ওনারা কতো খুশি হয়েছেন । আমি ওনাদের মনে কষ্ট দিতে পারবো না । তুমি আমায় ক্ষমা করো ।
এরপর তোমার বিয়ে আর আমার একাএকা পথ চলা শুরু । আজ দশ বছর পরে জিজ্ঞেস করছি কেমন আছো তুমি ? এখন একটু সাহসী হয়েছ কি ? বিয়েটা আমায় করলেই পারতে । আর হ্যা, প্রোমোশন পেয়ে পেয়ে তোমার স্বামীর উপরর পোস্টাই আমার । মানে এখন আসবে আমার কাছে । আসলে যোগাযোগ করো , কেমন ?

বাসন্তীর প্রতি প্রেমপত্র

আমার একটা পেয়ারা প্রেম ছিল । পেয়ারা প্রেম মানে হচ্ছে, সে প্রতিদিন গোসল করার সময় পেয়ারা নিয়ে আসতো আর দুজনে নদীর পাশে বসে খেতাম আর আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম । সে ছিল এলাকার সেরা সুন্দরী । এলাকার বড় ভাইরা আমার সাথে কথা বলতো না , আমি তার সাথে প্রেম করি বলে । প্রেম বোলতে এমন ছিল যে , সে এতো সুন্দর ছিল যে আমি তাকে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম । বিনিময়ে সে আমাকে প্রতিদিন টমেটো , তেতুল , পেয়ারা , বরই খাওয়াত । আমাকে ছাড়া পাগলীটা কিছু বুজত না । প্রতিদিন বিকেলে ওদের খেতের শশা , আখ তুলতে আমাকে নিয়ে যেত । আখ খেতে গেলেই ওর পায়ে কি যেন ব্যাথা হতো , হাটতেই পারতনা । ওকে ওটুকু কোলে করে পার করতে হতো । আর বুকের ভেতর সে গরম নিঃশ্বাস ফেলত । আমি কোথায় আছি সে ঠিক জানতো আর সেখানে চলে আসতো । দোতালার ঘরে একা আছি হঠাৎ দেখি সে এসে হাজির , নতুন জামা পরে আয়নার সামনে ভাব নিচ্ছি পেছনে দেখি সে । কোন অনুষ্ঠানে গেলে ছেলেরা ওর পিছু নিত আর আমি ছেলেদের সাথে ঝগড়া মারামারি করতাম । আর অনুষ্ঠান থেকে ফিরে আসার সময় সে হাটতেই পারতোনা , হাত ধরে কাঁধের উপর মাথা রেখে দুলতে দুলতে আসতো । মাঠে খেলতে গেলে ও আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে লাফাত আর দৌড়াত, আর সে কি হাসি । আজো সে হাসে তবে আমার বুকের ভেতর লুকিয়ে লুকিয়ে । আর আমি ওকে অনেক ভালবাসি । ও যে আমার সব ।

Saturday, September 10, 2016

যৌবনের গান , কাজী নজরুল ইসলাম


বার্ধক্য তাহাই—যাহা পুরাতনকে, মিথ্যাকে, মৃত্যুকে আঁকড়িয়া পড়িয়া থাকে, বৃদ্ধ তাহারাই—যাহারা মায়াচ্ছন্ন নব মানবের অভিনব জয় যাত্রার শুধু বোঝা নয়, বিঘ্ন; শতাব্দীর নব যাত্রীর চলার ছন্দে ছন্দ মিলাইয়া যাহারা কুচকাওয়াজ করিতে জানে না, পারে না; যাহারা জীব হইয়াও জড়; যাহারা অটল সংস্কারের পাষাণস্তূপ আঁকড়িয়া পড়িয়া আছে। বৃদ্ধ তাহারাই যাহারা নব অরুণোদয় দেখিয়া নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে দ্বার রুদ্ধ করিয়া পড়িয়া থাকে। আলোক-পিয়াসী প্রাণ চঞ্চল শিশুদের কল কোলাহলে যাহারা বিরক্ত হইয়া অভিসম্পাত করিতে থাকে, জীর্ণ পুঁতি চাপা পড়িয়া যাহাদের নাভিশ্বাস বহিতেছে, অতি জ্ঞানের অগ্নিমান্দ্যে যাহারা আজ কঙ্কালসার—বৃদ্ধ তাহারাই। ইহাদের ধর্মই বার্ধক্য। বার্ধককে সব সময় বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না। বহু যুবককে দেখিয়াছি যাহাদের যৌবনের উর্দির নিচে বার্ধক্যের কঙ্কাল মূর্তি। আবার বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি যাঁহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘলুপ্ত সূর্যের মতো প্রদীপ্ত যৌবন। তরুণ নামের জয়-মুকুট শুধু তাহারই যাহার শক্তি অপরিমাণ, গতিবেগ ঝঞ্ঝার ন্যায়, তেজ নির্মেঘ আষাঢ় মধ্যাহ্নের মার্তণ্ডপ্রায়, বিপুল যাহার আশা, ক্লান্তিহীন যাহার উৎসাহ, বিরাট যাহার ঔদার্য, অফুরন্ত যাহার প্রাণ, অটল যাহার সাধনা, মৃত্যু যাহার মুঠিতলে। তারুণ্য দেখিয়াছি আরবের বেদুইনদের মাঝে, তারুণ্য দেখিয়াছি মহাসমরে সৈনিকের মুখে, কালাপাহাড়ের অসিতে, কামাল-করিম-মুসোলিনি-সানইয়াৎ লেনিনের শক্তিতে। যৌবন দেখিয়াছি তাহাদের মাঝে—যাহারা বৈমানিকরূপে অনন্ত আকাশের সীমা খুঁজিতে গিয়া প্রাণ হারায়, আবিষ্কারকরূপে নব-পৃথিবীর সন্ধানে গিয়া আর ফিরে না, গৌরীশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার শীর্ষদেশ অধিকার করিতে গিয়া যাহারা তুষার-ঢাকা পড়ে, অতল সমুদ্রের নীল মঞ্জুষার মণি আহরণ করিতে গিয়া সলিলসমাধি লাভ করে, মঙ্গলগ্রহে, চন্দ্রলোকে যাইবার পথ আবিষ্কার করিতে গিয়া নিরুদ্দেশ হইয়া যায়। পবন-গতিকে পশ্চাতে ফেলিয়া যাহারা উড়িয়া যাইতে চায়, নব নব গ্রহ-নক্ষত্রের সন্ধান করিতে করিতে যাহাদের নয়ন-মণি নিভিয়া যায়—যৌবন দেখিয়াছি সেই দুরন্তদের মাঝে। যৌবনের মাতৃরূপ দেখিয়াছি—শব বহন করিয়া যখন সে যায় শ্মশানঘাটে, গোরস্থানে, অনাহারে থাকিয়া যখন সে অন্ন পরিবেশন করে দুর্ভিক্ষ বন্যা-পীড়িতদের মুখে, বন্ধুহীন রোগীর শয্যাপার্শ্বে যখন সে রাত্রির পর রাত্রি জাগিয়া পরিচর্যা করে, যখন সে পথে পথে গান গাহিয়া ভিখারী সাজিয়া দুর্দশাগ্রস্তদের জন্য ভিক্ষা করে, যখন দুর্বলের পাশে বল হইয়া দাঁড়ায়, হতাশের বুকে আশা জাগায়।
ইহাই যৌবন, এই ধর্ম যাহাদের তাহারাই তরুণ। তাহাদের দেশ নাই, জাতি নাই, অন্য ধর্ম নাই। দেশ-কাল-জাতি-ধর্মের সীমার ঊর্ধ্বে ইহাদের সেনানিবাস। আজ আমরা—মুসলিম তরুণেরা— যেন অকুণ্ঠিত চিত্তে মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি—ধর্ম আমাদের ইসলাম, কিন্তু প্রাণের ধর্ম আমাদের তারুণ্য, যৌবন। আমরা সকল দেশের, সকল জাতির, সকল ধর্মের, সকল কালের। আমরা মুরিদ যৌবনের। এই জাতি-ধর্ম-কালকে অতিক্রম করিতে পারিয়াছে যাঁহাদের যৌবন, তাঁহারাই আজ মহামানব, মহাত্মা, মহাবীর। তাহাদিগকে সকল দেশের সকল ধর্মের সকল লোক সমান শ্রদ্ধা করে।
পথ-পার্শ্বের ধর্ম-অট্টালিকা আজ পড় পড় হইয়াছে, তাহাকে ভাঙিয়া ফেলিয়া দেওয়াই আমাদের ধর্ম, ঐ জীর্ণ অট্টালিকা চাপা পড়িয়া বহু মানবের মৃত্যুর কারণ হইতে পারে। যে-ঘর আমাদের আশ্রয় দান করিয়াছে, তাহা যদি সংস্কারাতীত হইয়া আমাদেরই মাথায় পড়িবার উপক্রম করে, তাহাকে ভাঙিয়া নতুন করিয়া গড়িবার দুঃসাহস আছে একা তরুণেরই। খোদার দেওয়া এই পৃথিবীর নিয়ামত হইতে যে নিজেকে বঞ্চিত রাখিল, সে যত মোনাজাতই করুক, খোদা তাহা কবুল করিবেন না। খোদা হাত দিয়াছেন বেহেশত ও বেহেশতি চিজ অর্জন করিয়া লইবার জন্য, ভিখারীর মতো হাত তুলিয়া ভিক্ষা করিবার জন্য নয়। আমাদের পৃথিবী আমরা আমাদের মনের মতো করিয়া গড়িয়া লইব। ইহাই হউক তরুণের সাধনা।